ফিল্ড জার্নাল আর্কাইভ
AI-এর প্রথম আলো, বাঘইল গ্রামে
আমরা যখন AI নিয়ে কথা বলি, মাথায় আসে বড় শহর, দ্রুত ইন্টারনেট, ল্যাপটপের স্ক্রিন। কিন্তু বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার বাঘইল গ্রামে সেদিন বাস্তবতাটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ঘরে বসে আছে প্রায় ২৫ জন কিশোর-কিশোরী। বেশিরভাগের হাতে স্মার্টফোন নেই। ইন্টারনেট চেনে, কিন্তু ব্যবহার করে মূলত ভিডিও দেখতে। ChatGPT বা Claude, এই নামগুলো তারা আগে কখনো শোনেনি।
তাদের মধ্যে ১৭-১৮ জন সেদিন প্রথমবারের মতো AI ব্যবহার করল বা অন্তত দেখল। অনেকে আরো এক ধাপ পেছনে, তারা "AI" শব্দটাই প্রথম শুনলো সেদিন। এটা ছিল সারাদেশে AI-এর প্রথম ওয়ার্কশপ। আর এটা শুরু হয়েছিল একটা গ্রামে, খোলা জায়গায়, ফোন আর ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয়।
সারাদেশে AI বরাবরই বিশ্বাস করে, সুযোগ শুধু শহরের ছেলেমেয়েদের জন্য না। কিন্তু কাজ শুরু করতে গিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল, প্রযুক্তির অগ্রগতি আর প্রযুক্তির প্রসার এক জিনিস না। শহরে যখন GPT, Claude নিয়ে আলোচনা চলছে, গ্রামের একটা মেধাবী ছেলে বা মেয়ে তখনো জানে না যে এই টুলগুলো তার পড়াশোনায়, তার ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে। সেই ফাঁকটা ছোট করার জন্যই বাঘইলে যাওয়া আমাদের এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
শুরুতে একটাই প্রশ্ন ছিল, AI আসলে কী? জটিল সংজ্ঞা দিইনি। বোঝালাম সহজ ভাষায়। AI হলো এমন একটা সিস্টেম যেটাকে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়, তোমার লেখায় সাহায্য করে, তথ্য খুঁজে দেয়, অনেকটা একজন জ্ঞানী বন্ধুর মতো যে সবসময় পাশে থাকে। এই সহজ বোধটা যখন তাদের মধ্যে তৈরি হলো, তখনই আসল কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করল।
"আমরা শেখাতে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাদের উত্তর, তাদের বিভ্রান্তি, তাদের কৌতূহল, এটাই বলে দিল আসলে কোথায় কাজ করতে হবে।"
এরপর আমরা সরাসরি বাস্তব ব্যবহারে চলে গেলাম। পড়াশোনায় কীভাবে AI কাজে লাগানো যায়, কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানো, রচনা লেখায় সাহায্য নেওয়া, ইতিহাস বা বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, সব কিছুই যখন তাদের সামনে উন্মোচিত হলো, তখন ঘরের পরিবেশটাই বদলে গেল।
ল্যাপটপের ছোট স্ক্রিনে ChatGPT-তে যখন টাইপ করা হলো বা Claude-এ প্রশ্ন করা হলো, তখন যারা আগে কখনো এসব দেখেনি, তাদের চোখের বিস্ময় ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শেখানো শেষে আমরা যখন চুপ করলাম এবং তাদের কাছে জানতে চাইলাম কতটুকু বুঝলে, তখন তারা একে একে তাদের ভাবনাগুলো বলতে শুরু করল।
এই মুহূর্তটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ আমরা যা শিখিয়েছি, তারা সেটাকে তাদের মতো করে গ্রহণ করেছে। আমরা বুঝতে পারলাম গ্রামের ছেলেমেয়েদের সমস্যা সামর্থ্যের না, বরং সমস্যা হলো এক্সপোজারের। তারা শিখতে পারে, বুঝতে পারে, শুধু সুযোগটা পায় না।
AI একটা লেভেলিং টুল হতে পারে। শহর আর গ্রামের মধ্যে তথ্যের ফাঁকটা ছোট করার একটা বড় সুযোগ এখানে আছে। বাঘইল আমাদের সেই দৃঢ় বিশ্বাসের শুরু মাত্র। সারাদেশে AI-এর যাত্রা এখানে থামছে না। সামনে আরো গ্রাম আছে, আরো কিশোর-কিশোরী আছে এবং তাদের সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য আরো অসংখ্য ওয়ার্কশপ হবে।
AI-এর পরের ধাপ, জলেশ্বরীতলায়
বাঘইলে আমরা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। জলেশ্বরীতলায় এসে একটু গভীরে গেলাম। এবারের ২০ জন অংশগ্রহণকারী AI-এর নাম জানে, কিছুটা ব্যবহারও করে। কিন্তু ব্যবহারটা ছিল অগোছালো। ঠিকমতো প্রশ্ন করতে পারে না, কোন কাজে কোন টুল লাগাবে সেটা পরিষ্কার না, আর video, photo বা audio যে AI দিয়ে তৈরি করা যায় সেটা অনেকের কাছেই ছিল পুরো নতুন একটা ধারণা।
AI ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষ জানে না কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। একটা অস্পষ্ট প্রশ্ন করলে অস্পষ্ট উত্তর আসে। কিন্তু যদি নির্দিষ্ট করে, context দিয়ে, সঠিক ভাষায় বলা যায়, তাহলে AI যা দেয় তা সম্পূর্ণ আলাদা। এই পার্থক্যটা সেদিন হাতে-কলমে দেখানো হলো। একই বিষয়ে দুইভাবে প্রশ্ন করা হলো, একটা সাধারণভাবে, আরেকটা গুছিয়ে। দুটো উত্তরের ফারাক দেখে অনেকেই বুঝল prompting আসলে একটা দক্ষতা, এটা চর্চা করলে ভালো হওয়া যায়।
এরপর ফোকাস করা হলো দৈনন্দিন ব্যবহারে। পড়াশোনায় AI কীভাবে কাজে লাগানো যায়, নোট তৈরি করা, কঠিন বিষয় সহজ ভাষায় বোঝা, পরীক্ষার আগে দ্রুত revision করা, বড় লেখার সারসংক্ষেপ বানানো। AI যে একটা personal tutor হতে পারে যে ২৪ ঘণ্টা পাশে থাকে, এই ধারণাটা অনেকের কাছে সেদিন প্রথম বাস্তব মনে হলো।
সময় বাঁচানো মানে আরো বেশি কাজ করা, এটা সেদিন অনেকে নতুনভাবে বুঝল। productivity-র দিক থেকেও দেখানো হলো, ছোট ছোট কাজ যেগুলোতে অনেক সময় যায়, সেগুলো AI দিয়ে কীভাবে দ্রুত করা যায়। লেখা তৈরি করা, ধারণা সাজানো, পরিকল্পনা করা।
"এটা শুধু পড়াশোনার টুল না, এটা ক্রিয়েট করার সুযোগ। যে আগে কখনো ভাবেনি ভিডিও বানাতে পারবে, সে সেদিন দেখল যে সেও পারে।"
সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হলো media generation দেখানোর সময়। AI দিয়ে ছবি বানানো যায়, ভিডিও বানানো যায়, voice তৈরি করা যায়, এটা শুনলে অনেকে এখনো বিশ্বাস করে না। কিন্তু সেদিন সরাসরি দেখানো হলো। prompt লিখে ছবি তৈরি হলো, ভিডিও generate হলো, audio তৈরি হলো। শুধু দেখা না, অনেকে নিজেরাও চেষ্টা করল।
শেষ পর্বে দেখানো হলো AI দিয়ে ওয়েবসাইট বানানোর ধারণা। কোড জানতে হবে না, programming শিখতে হবে না। AI-কে বললেই সে কোড লিখে দেয়, structure তৈরি করে দেয়। একটি কাজের ওয়েবসাইট দাঁড় করানো সম্ভব শুধু সঠিকভাবে বলতে পারলেই।
দুটো ওয়ার্কশপ, দুটো আলাদা জায়গা, দুই ধরনের মানুষ। বাঘইলে যারা ছিল তারা প্রথমবার AI-এর নাম শুনেছে। জলেশ্বরীতলায় যারা ছিল তারা জানে, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছিল না। দুটো দলকে দুটো আলাদা জায়গা থেকে এগিয়ে দেওয়া গেছে। এটাই সারাদেশে AI-এর কাজের ধরন। সবাইকে একই জায়গা থেকে শুরু করাতে হবে না। যে যেখানে আছে, তাকে সেখান থেকে এগিয়ে দিতে হবে।
বগুড়ায় দুটো ওয়ার্কশপ শেষ হলো। কিন্তু এটা শেষ না, এটা শুরু। যাত্রা চলছে।
সারাদেশে AI · বগুড়া · বাংলাদেশ